যে কারণে হলবিমুখ দর্শক

চলচ্চিত্র মানুষের বিনোদনের একটি প্রধান মাধ্যম। আর এর প্রসারের অন্যতম বাহন হলো সিনেমা হল। যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে এই বাংলাদেশে দিন দিন কমছে সিনেমা হলের সংখ্যা। ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে হলগুলো।

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির তথ্যমতে, দেশে সচল সিঙ্গেল স্ক্রিনের সংখ্যা ৬২। দেশের ২৫টি জেলায় নেই কোনো সিনেমা হল। অথচ নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে ছিল ১৪৩৫টি সিনেমা হল।

হল বন্ধ হওয়ার পেছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখলে অনেক বিষয় একসঙ্গে সামনে চলে আসে। এর প্রধান কারণগুলোর একটি হলো ভালো সিনেমা তৈরি না হওয়া।

মানসম্মত সিনেমার অভাব
হলের লোকসান হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ দর্শক না থাকা। দর্শক যা দেখতে আসবে সেই সিনেমায় রয়েছে সৃজনশীলতার অভাব। বাংলাদেশে তেমন সৃজনশীল সিনেমা বানানো হয় না বললেই চলে। যে কারণে এই ইন্ডাস্ট্রির বয়স ৫০ বছর হয়ে গেলেও বিশ্ব মানচিত্রে তেমন করে জায়গা করে নিতে পারেনি। এমনকি জায়গা করতে পারছে না নিজস্ব দর্শকের মনেও।

অশ্লীলতার ছড়াছড়ি এবং নকল কাহিনীতে তৈরি সিনেমায় রুচি হারিয়েছে এদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ। এই দর্শক ভালো সিনেমা পেলে হলে ফেরত আসতে চায়। তবে নেই সেই পরিবেশ। দর্শক খরায় ভুগে লোকসানে অসংখ্য হল বন্ধ হয়ে গেছে। তাই হঠাৎ ভালো একটা সিনেমা এলেও ইচ্ছা থাকলেও হলে ফেরত আসার সুযোগ পান না অনেক দর্শক।

ভালো সিনেমা পেলে এখনো যে দর্শক হলে ছুটে যায় তার প্রমাণ পাওয়া যায় সিনেপ্লেক্সের দিকে তাকালে। বিদেশি হিট সিনেমার টিকিটের জন্য চারিদিকে হাহাকার সৃষ্টি হয়। মুক্তি পাওয়ার প্রথমদিনই মানুষ সিনেমা দেখতে হামলে পড়ে।

অনেকে বলবে বিদেশি ব্লকবাস্টার সিনেমা দেখে এই অবস্থা। বাংলা সিনেমা হলে এমন অবস্থা দেখা যাবে না। কিন্তু ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘আয়নাবাজি’-এর ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল দর্শকের উপচে পড়া ভিড়। টিকিট কাটতে দুইদিন আগে থেকেই বুকিং দিয়ে রাখতে হয়েছিল দর্শকদের। এতে বলাই যায় দর্শক সুযোগ পেলে অবশ্যই আবার হলে ফেরত আসবে। তবে তাদেরকে দিতে হবে দেখার মতো সিনেমা, দিতে হবে উপযুক্ত পরিবেশ।

দর্শককে হলে ফেরাতে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে ভালো ও সৃজনশীল চলচ্চিত্র। হালকা বিনোদনে ভরপুর বাণিজ্যিক সিনেমা মুক্তি পেলেও তা এখন আর হল ভরাতে পারে না।

একসময় রুচিসম্মত পারিবারিক সিনেমা মুক্তি পেতো যা দেখতে মানুষ পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আসত। আর বর্তমানে বাজে চিত্রায়ন, খারাপ অভিনয়, উৎকট নাচ ও গানসমৃদ্ধ আইটেম গান প্রভৃতিই যেন এখন একটি বাণিজ্যিক সিনেমার মূল বলে প্রতিষ্ঠিত।

সিনেমার স্ক্রিপ্টের ক্ষেত্রে রয়েছে সৃজনশীলতার অভাব। আমাদের এখানে ভালো গল্প বলিয়েদের সংখ্যা কমতে কমতে এখন যেন তা তলানিতে। স্ক্রিপ্ট লেখকদের প্রযোজকরা ধরিয়ে দেন তামিল-তেলেগু সিনেমার কিছু দৃশ্য- বলাই হয় সেগুলো থেকে নকল করে স্ক্রিপ্ট বানাতে।

স্ক্রিপ্ট লেখকরাও জীবিকার তাগিদে এসব দিয়েই তৈরি করেন এক-একটি জগাখিচুড়ি। যার না থাকে কোনো শুরু, না থাকে কোনো শেষ। দর্শক মাঝে মাঝে বুঝতেই পারেন না, তারা কী দেখছেন? কেন দেখছেন? নতুন করে নতুন কিছু যেন বলার নেই।

এ গণ্ডি থেকে বের হতে হবে। আমাদের গল্প আমাদেরই বলতে হবে। অন্যের অনুকরণ করে হয়তো ক্ষণিকের চমক দেয়া যায়। তবে তা থেকে প্রাপ্তির খাতা শূন্যই রয়ে যায়।

চলচ্চিত্রের কাহিনী যত জীবনের কাছের কিছু হবে তত তা দর্শককে টানবে। হচ্ছে উল্টো, এখন বাংলা সিনেমস বাস্তবতা বিবর্জিত, অদ্ভুত এক ফ্যান্টাসির রাজ্য যেন।

শিল্পীর পোশাক বা লোকেশন দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই সে কোন জনগোষ্ঠীর বা কোন সমাজ-সংস্কৃতির। জগাখিচুড়িতে এমন হওয়াটাই যেন স্বাভাবিক।

অবকাঠামোর অবনতি
দর্শক হলে না আসার আরেকটি কারণ হলো- হলগুলোতে বিদ্যমান অবকাঠামোর অবনতি। এছাড়া রয়েছে ভঙ্গুর পরিবেশনা ও দর্শন ব্যবস্থার অবনতি। যুগের সঙ্গে প্রদর্শন ব্যবস্থার পরিবর্তন ও আধুনিকীকরণ না হওয়াও রয়েছে এই কারণগুলোর মধ্যে। ডিজিটাল প্রক্রিয়াকে নির্মাতারা আয়ত্তে আনার চেষ্টা করলেও সে অনুযায়ী হলের ডিজাটালাইজেশন না হওয়ায় এ চেষ্টা রয়ে গেছে ব্যর্থতার খাতায়।

হলের পরিবেশ
দর্শক বিমুখতার পেছনে আরো একটি বড় কারণ হলো হলের পরিবেশ। দর্শক কমতে থাকায় হল ও এর আশপাশের পরিবেশ এখন বখাটেদের দখলে। নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকেই আসতে চান না হলে।

মাল্টিপ্লেক্সের অভাব
দেশের বড় সিনেমা হলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সামনে বেঁচে থাকা হলগুলোও ধুঁকতে ধুঁকতে বন্ধ হয়ে যাবে- এই যেন বাস্তবতা। সময় এখন মাল্টিপ্লেক্সের। বাড়ছে এর জনপ্রিয়তা। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি দেশের মানুষের রুচিও পরিবর্তীত হচ্ছে। দর্শক চায় আরামদায়ক ও ভালো পরিবেশে বসে সিনেমা দেখতে।

১৫ বছর আগে বসুন্ধরা শপিং মলে যাত্রা শুরু করে স্টার সিনেপ্লেক্স। পরবর্তীতে ধানমন্ডি, মিরপুর ও মহাখালীতে এর আরও তিনটি শাখা চালু করা হয়। এছাড়া রয়েছে যমুনা ফিউচার পার্কে ব্লকবাস্টার সিনেমাস, শ্যামলী সিনেপ্লেক্স ও চট্টগ্রামের সিলভার স্ক্রিন।

সিঙ্গেল স্ক্রিনের দর্শক কমতে শুরু করেছে। যার সাক্ষী বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলো। বিপরীতে বেড়ে গিয়েছে সিনেপ্লেক্সে দর্শকের সংখ্যা। সেখানে দেশির পাশাপাশি হলিউডের সিনেমাও উপভোগ করতে পারে দর্শক। টিকেটের দাম বেশি হলেও মানুষ তা দিয়েও সুন্দর পরিবেশে সিনেমা দেখতে আগ্রহী। সারাদেশেই মাল্টিপ্লেক্সের নির্মাণ বাড়াতে হবে।

শহুরে দর্শকের পাশাপাশি মফস্বল বা গ্রামীন দর্শকরাও যেন সিনেপ্লেক্সের সুবিধা পান সেদিকে নজর দিতে হবে।

প্রযুক্তির উন্নয়ন
প্রযুক্তির কল্যাণে এখন বিনোদনের উৎসের অভাব নেই। ইন্টারনেটের এই যুগে এখন যেকোনো সংস্কৃতির, যেকোনো ভাষার সিনেমা-সিরিজ সহজেই পাওয়া যায় হাতের কাছে। ইন্টারনেট প্রোভাইডাররাও সার্ভারে বিভিন্ন সিনেমা আপলোডের মাধ্যমে ব্যাপারটি করে তুলেছেন আরো সহজ।

এছাড়া বর্তমানে বেড়েছে ওভার দা টপ (ওটিটি) প্লাটফর্মের ব্যবহার ও চাহিদা। বাড়ছে দেশি-বিদেশি ওয়েব প্লাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন। বিনোদনের সর্বশেষ এই সংযোজনের মানুষের আগ্রহ বাড়ায় এখানেও প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন কনটেন্ট। দর্শক চাইলেই যখন-তখন দেখে নিতে পারছেন তাদের পছন্দের কনটেন্ট।

তবে বড় পর্দার চাহিদা অন্যরকম। সত্যিকারের সিনেমা প্রেমিকের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যাবে তার কাছে বড় পর্দা কতটুকু গুরুত্ব বহন করে। প্রযুক্তির উন্নয়ন সময়ের দাবি। সে থাকবেই। তার সঙ্গে সিনেমা হলকেও তাল মিলিয়ে চলার মতো করে উপযুক্ত করে তুলতে হবে। নইলে দর্শক ফোনের বিনোদনে আসক্ত হলে তাদের টেনে বের করে হলে নেয়া আরও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।

পাইরেসির থাবা
এছাড়া রয়েছে পাইরেসি। সিনেমা মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। তাই গাটের টাকা খরচ করে হলে সিনেমা দেখার চেয়ে মোবাইলে ফ্রিতে সিনেমা দেখা বেশি সহজ মানুষের জন্য।

অভ্যস্ত না হওয়া
বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ বড় হয়েছে সিনেমা হল না দেখেই। তারা অভ্যস্ত বাসার আরামদায়ক পরিবেশে সিনেমা দেখে। পয়সা খরচ করে বাইরে গিয়ে বাজে পরিবেশে সিনেমা দেখা তাদের টানবে না- এটিই স্বাভাবিক। অভ্যস্ততা তৈরি করাও এখন একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার জন্য সংস্কৃতিচর্চার স্থান ও পরিবেশ ঠিক থাকা জরুরি। মানুষের আগের মতো সেই সময়ও নেই যে সে হলে গিয়ে সিনেমা দেখবে। একটা সময় ছিলো যখন শো শেষ হওয়ার পর দল বেধে মানুষজন যখন রাস্তা দিয়ে যেত তখন মিছিলের মত দেখা যেত। এসব স্মৃতি এখন শুধু অতীত।

এই অতীতের দিন ফিরিয়ে আনা বেশ কঠিন কাজ। সবদিক দিয়ে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের এমন ভঙ্গুর অবস্থা, যা ঠিক করতে বহুদিন লাগবে। এজন্য প্রয়োজন সকলের সমন্বিত উদ্যোগ ও স্বদিচ্ছা। সেটি সরকার থেকে শুরু করে দর্শক সকলের পক্ষ থেকে প্রয়োজন।

সরকারের উচিত শিল্পকে বাঁচাতে ব্যবস্থা নেয়া, প্রযোজকদের উচিত সঠিক প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজে আসা, সিনেমার সঙ্গে জড়িত সকলের উচিত নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। দায়সারা কাজ করে গেলে এখন আর হবে না। দর্শকেরও উচিত ভালো সিনেমা হলে গিয়ে দেখা। এতে ভালো সিনেমা ও কলাকুশলীদের উৎসাহ বেড়ে যায়।

বাংলা সিনেমার সোনালী দিন শুধু অতীতেই থেকে যাবে না এই হলো সর্বশেষ আশা। সোনালী, রুপালী, হিরে- যেভাবেই হোক সিনেমার দিন ফিরে আসবে আবার।

হলগুলো আবারও মুখরিত হবে দর্শকের পদচারণায়। সিনেমা ফিরে পাবে তার পুরনো দিনের জৌলুস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *