যমজ সন্তান কেন হয়?

আজকাল বাংলাদেশে যমজ সন্তান হবার সম্ভবনা আগের চেয়ে অনেক বেশী। আজকাল অনেক মায়েরাই দেরীতে সন্তান গ্রহণ করেন এবং বর্তমান সময়ে নিঃসন্তান দম্পতিদের চিকিৎসার অগ্রগতির কারণে যমজ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে গেছে। এই জন্য শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতেই যমজ সন্তান জন্মানোর প্রকোপ বেড়ে গেছে। প্রতি ৬৫ জনে একজন মায়ের সাধারণ প্রক্রিয়াতেই দুটি যমজ সন্তান হতে পারে। মায়ের পরিবারে কেউ যমজ থেকে থাকলে এর সম্ভাবনা বেশি থাকে। প্রতি ১০,০০০ এ একজন মায়ের তিনটি যমজ সন্তান হতে পারে। চারটি যমজ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম। দুই রকমের যমজ সন্তান হতে পারে।

#অভিন্ন যমজ শিশু (আইডেন্টিক্যাল টুইন)

একটি নিষিক্ত ডিম্বাণু প্রথমে দুইটি পৃথক কোষে বিভক্ত হয়। পরবর্তীতে প্রতিটি কোষ থেকে একেকটি শিশুর জন্ম হয়। এভাবেই অভিন্ন যমজ শিশুর (আইডেন্টিক্যাল টুইন) জন্ম হয়। এখানে দুটি কোষ যেহেতু পূর্বে একটি কোষ ছিল, তাই এদের সব জীন একই হয়ে থাকে। একারণে এরা দেখতে অভিন্ন হয় এবং একই লিঙ্গের হয়।

#ভিন্ন চেহারার যমজ শিশু (নন আইডেন্টিক্যাল টুইন)

যেসব যমজ শিশু দেখতে ভিন্ন হয়, তারা আসলে ‘নন আইডেন্টিক্যাল টুইন’। এটি বেশী হয়।

মায়ের দেহে সাধারণত একই সময়ে একটি মাত্র ডিম্বাণু দুটি ডিম্বাশয়ের যে কোনও একটি থেকে নির্গত হয়। যদি দুটি ডিম্বাশয় থেকেই একটি করে ডিম্বাণু একই সময়ে নির্গত হয়, তবে ওভ্যুলেশন পিরিয়ডে তার শরীরে মোট দুটি ডিম্বাণু থাকে। এসময় মিলন হলে পুরুষের শুক্রাণু উভয় ডিম্বাণুকেই নিষিক্ত করে। এভাবেই নন-আইডেন্টিক্যাল টুইন শিশুর জন্ম হয়। এসব শিশু সবসময় একই লিঙ্গের নাও হতে পারে এবং তারা দেখতে ভিন্ন হয়।

#আপনার কখন যমজ সন্তান হতে পারে

আপনি সন্দেহ করতে পারেন যে আপনার যমজ সন্তান হবে যদি –

গর্ভধারণের শুরু থেকেই বেশি বেশি শরীর খারাপ লাগতে থাকলে
গর্ভাবস্থায় পেটের আয়তন স্বাভাবিক নিয়মের তুলনায় বেশ বাড়লে
পরিবারে কেউ যমজ থাকলে
চিকিৎসার মাধ্যমে নিঃসন্তান মায়েরা যখন গর্ভধারণ করেন
গর্ভধারণের ৮-১৪ মাসের মাথায় আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় যমজ সন্তান হবে কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়। অভিন্ন যমজ কিনা তাও এসময় বলা যেতে পারে। না পারা গেলে পরবর্তী সময়ে আবার পরীক্ষা করিয়ে জেনে নেওয়া যায়।

এই সময় আপনাকে বলে দেয়া যাবে যে আপনার শিশুরা কি একটি গর্ভফুলই ভাগাভাগি করে বেঁচে অ্যছে (তার মানে তারা অভিন্ন যমজ শিশু – আইডেন্টিক্যাল টুইন), নাকি তাদের প্রত্যেকের নিজের গর্ভফুল আছে (মানে তারা অভিন্ন চেহারার যমজ শিশু – আইডেন্টিক্যাল টুইন হতে পারে, আবার নাও হতে পারে)। এটা যদি বোঝা না যায়, তাহলে আপনাকে আবার একবার আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষার জন্য আসতে বলা হতে পারে। এক-ত্রিতিয়াংশ অভিন্ন যমজ শিশু – মানে আইডেন্টিক্যাল টুইন এর ভিন্ন গর্ভফুল থাকে। এটি হয় যখন নিষিক্ত ডিম্বাণুর কোষগুলো জরায়ুতে বসার আগেই দুই ভাগ হয়ে যায়, সাধারণত্ব ডিম্বাণু নিষিক্ত হবার ৪ দিনের মধ্যে।

যমজ সন্তান কেন হয়?

কেউ জানেনা কেন এই অভিন্ন যমজ শিশু – আইডেন্টিক্যাল টুইন হয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে জাতিগত নির্বিশেষে সব মায়েরই অভিন্ন যমজ শিশু হওয়ার সমান সুযোগ আছে, এবং প্রতি ৩৫০-৪০০ গর্ভাবস্থার মধ্যে ১ টিতে অভিন্ন যমজ শিশুর জন্ম হতে পারে। অভিন্ন যমজ শিশু কোন পরিবারে থাকলে বার বার এরকম হবে তেমন কোন কথা নেই।

যেসব কারণে ভিন্ন চেহারার যমজ শিশু (নন আইডেন্টিক্যাল টুইন) হওয়ার সম্ভবনা বেশী থাকে তা হল –

ভিন্ন চেহারার যমজ শিশু সাধারণত্ব কালো জনগোষ্ঠীতে বেশী দেখা যায়
মায়ের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভিন্ন চেহারার যমজ শিশু হওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যায় এবং আপনার যদি অনেক সন্তান থাকে – মানে আপনি যদি অনেকবার গর্ভধারণ করে থাকেন, তাহলেও এই সম্ভবনা অনেক অংশেই বেড়ে যায়।

মায়ের দিকের পরিবারে যদি ভিন্ন চেহারার যমজ শিশু প্রবণতা থাকে, তাহলে মায়ের ভিন্ন চেহারার যমজ শিশু হতে পারে, তবে এই প্রবণতা যদি বাবার পরিবারে থাকে তাহলে যমজ শিশু হওয়ার সম্ভবনা কম।
সন্তান গর্ভে আনার জন্য যে বিভিন্ন রকমের চিকিৎসা আছে, যেমন IVF, Assisted conception – এই সব পদ্ধতিতে একের বেশী ভ্রূণ গর্ভে রোপণ করা হয়। তাই এইসব চিকিৎসা ফলে যেই মায়েরা গর্ভবতী হন, তাদের গর্ভে একের অধিক সন্তান আসার সম্ভবনা স্বাভাবিক গর্ভাবস্থার চেয়ে অনেক বেশী। তাছাড়া মেয়েদের বেশী বয়সে গর্ভধারণ একটি কারণ। বেশী বয়সে গর্ভধারণ করলে যমজের হার বেড়ে যায়। বিভিন্ন বয়সের মেয়েদের যমজ সন্তান গর্ভে আসার হার নিম্নে দেওয়া আছে –

৬.৩% যেই মায়েদের বয়স ২০ এর কম
২১.৭% যেই মায়েদের বয়স ৩৫-৩৯ বছরের মধ্যে
৫৬.৫% যেই মায়েদের বয়স ৪৫ এর ঊর্ধ্বে
আমার সন্তানরা কি অভিন্ন যমজ কিনা আমি কীভাবে বুঝব?

অভিন্ন যমজ কিনা তা বোঝার সবচেয়ে সঠিক উপায় হল ডিএনএ পরীক্ষা যা সন্তান জন্মানোর পরে করা সম্ভব। আপনার প্রথম আলট্রাসাউন্ড ১৪ সপ্তাহের আগেই করা হলে আপনার শিশুদের প্লাসেন্টা কেমন তা এসময়েই সঠিক বোঝা যাবে। এছাড়াও প্লাসেন্টা জন্মের পরও পরীক্ষা করা যায়। যদিও কোন প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণ সঠিক নয়।

সকল ভিন্ন যমজ এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অভিন্ন যমজের একই ধরনের প্লাসেন্টা থাকে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক শিশুর নিজস্ব আলাদা প্লাসেন্টা এবং তার ভিতরে এবং বাইরে আলাদা আলাদা পর্দা থাকে। এধরনের যমজদের বলা হয় ডাইকরিওনিক ডাইঅ্যামনিওটিক (ডিসিডিএ)।

দুই-তৃতীয়াংশ অভিন্ন যমজ একই প্লাসেন্টায় একই বাইরের পর্দা নিয়ে থাকে যেখানে ভিতরের পর্দা থাকে ২ টি। এদের বলা হয় মনোকরিওনিক ডাইঅ্যামনিওটিক (এমসিডিএ)। প্রায় ১% এমসিডিএ যমজদের প্লাসেন্টায় ভিতরের পর্দাও একই হয়। এদের বলা হয় মনোকরিওনিক মনোঅ্যামনিওটিক (এমসিএমএ)।

আপনার গর্ভে যমজ সন্তান থাকলে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কেননা যমজ শিশুর জটিলতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিশেষত অপরিপক্ক শিশু হওয়ার একটা আশংকা থেকেই যায়। অভিন্ন যমজ হলে ১৬ সপ্তাহের পর প্রতি ২-৩ সপ্তাহ অন্তর আল্ট্রাসাউন্ড করা ভাল, অভিন্ন না হলে ৪ সপ্তাহ অন্তর। যমজ সন্তান হলে সিজার করাটাই নিরাপদ। কিন্তু স্বাভাবিক উপায়ে সন্তানের জন্ম দিতে চাইলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

যমজ সন্তানদের খাওয়ানো

দুটি এবং তিনটি যমজ সন্তান হলেও স্তন্যপান করাতে সমস্যা হয় না। এক্ষেত্রে বুকের দুধের পাশাপাশি বোতলে করেও খাওয়াতে পারেন। এ সম্পর্কে আরও দেখুন ‘স্তন্যদান’ এবং ‘ফিডার খাওয়ানো’ পরিচ্ছেদে।

যমজদের নিয়ে কিছু ভুল ধারনা

যমজ বাচ্চাদের নিয়ে অনেক ভুল ধারনা আছে। কিন্তু এখানে কিছু ভুল ধারনা আর সত্যতার পার্থক্য নিরূপণ করা হয়েছে।

ধারনাঃ যমজ বাচ্চা হওয়ার সাথে পারিবারিক ইতিহাসের সম্পর্ক আছে।

সত্যতাঃ যমজ বাচ্চা হওয়ার সাথে পারিবারিক ইতিহাসের সম্পর্ক আছে এমন কোন প্রমান নেই। তবে কোন পরিবারে আগে থেকে ভিন্ন যমজ বাচ্চা হওয়ার জেনেটিক অবস্থান থেকে থাকতে পারে। এর কারণ হতে পারে সম্ভবত প্রতিমাসে নারীর গর্ভাশয় থেকে এক এর বেশী ডিম্বাণু নিঃসরণ হওয়ার কারণে।

ধারনাঃ যমজ বাচ্চা এক প্রজন্ম বিরতি দিয়ে হয়

সত্যতাঃ এটা একটা প্রচলিত ভুল ধারনা যে এক প্রজন্ম বিরতি দিয়ে পরের প্রজন্মে যমজ বাচ্চা হয়। আমরা এমন অনেককেই বলতে শুনে থাকি, কারো বাবার যমজ ভাই বা বোন থাকলে, কিন্তু সেই ব্যক্তির যমজ না থাকলে, ভবিষ্যতে তার যমজ সন্তান হবে। এই ধারনার পক্ষে কোন যুক্তি নেই। কিন্তু কিছু নারীর জেনেটিকভাবেই হাইপার ওভুলেশন হয়ে থাকে যাতে তাদের গর্ভাশয়ে প্রতি মাসিক চক্রে একের অধিক ডিম্বাণু তৈরি হয়। এই নারীদের যমজ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে। তাই এক্ষেত্রে প্রায় প্রতি প্রজন্মেই যমজ সন্তান হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। এর কোন বাধা ধরা নিয়ম নেই।

ধারনাঃ মর্নিং সিকনেস বেশী হওয়া মানেই যমজ বাচ্চা হবে।

সত্যতাঃ হবেই এমনটা নয়। একের অধিক সন্তানধারন করছেন এমন অনেক মা-ই মর্নিং সিকনেসে ভুগেন আবার অনেক মা-ই আছেন যাদের মর্নিং সিকনেস হয় না। অনেক গর্ভবতী মায়েরা বমি বমি ভাব অনুভব করেন, আবার অনেকে করেন না, এর সাথে যমজ বাচ্চা হওয়ার সম্পর্ক নেই।

ধারনাঃ যমজ বাচ্চাদের আলাদা নিজস্ব ভাষা আছে।

সত্যতাঃ যমজদের নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া অনেক ভাল এবং তাদের সম্পর্ক অনেক গভীর, এর ফলে তাদের নিজস্ব যোগাযোগ পদ্ধতি থাকতে পারে। আবার নিজেদের মধ্যে বেশী সময় পার করার ফলে একজনের বলা ভুল শব্দ অন্যজন বুঝতে পারে ও বলতে পারে যা বাইরের কেউ বলতে পারে না। এতে অন্যদের মনে হতে পারে যে যমজদের নিজস্ব ভাষা আছে।

ধারনাঃ সব গর্ভাবস্থা যমজ অবস্থায় শুরু হয়।

সত্যতাঃ সব গর্ভাবস্থা যমজ অবস্থায় শুরু হয় এটি সত্য নয়। তবে শুরুর দিকের গর্ভাবস্থায় করা স্ক্যান থেকে জানা যায় যে অনেক গর্ভাবস্থা-ই দুটি ডিম্বাণু নিয়ে শুরু হয়।
১২ সপ্তাহের আগে যদি স্ক্যান করা হয় তবে দুটি ফিটাল হৃদস্পন্দন ও দুটি ফিটাল থলে দেখা যায়। তবে ১২ সপ্তাহের মধ্যে এদের একটি চলে যায়। এর কারণ হচ্ছে একটি ডিম্বাণু সেখানে থাকতে পারে না এবং তা গর্ভে আবার শোষিত হয়ে যায়। একে ভ্যানিশিং টুইন সিনড্রোম বলে, এতে গর্ভে থাকা শিশুর উপরে কোন শারীরিক প্রভাব পড়ে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *